FANDOM


শহীদ আবদুল হামিদ (মার্চ ৪, ১৯৫০ - নভেম্বর ১৯, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কক্সবাজার জেলার অন্যতম সংগঠক। তিনি গেরিলা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করে অমানুষিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করে তিনি শহীদ উপাধিতে ভূষিত হন।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন Edit

শহীদ আবদুল হামিদ কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার মাতামুহুরি নদী বিধৌত তিনদিকে পাহাড় ঘেরা অপূর্ব সৌন্দর্যমন্ডিত উপত্যকাসম বমু বিলছড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত বাঙালি মুসলিম পরিবারে ১৯৫০ সালের ৪ মার্চ জন্মগ্রহন করেন।[১] তাঁর পিতার নাম আবদুল ফাত্তাহ মাস্টার এবং মাতার নাম গুলফরাজ খাতুন। তিনি সম্মান শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। প্রথমে তাঁকে বিলছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। এরপর তিনি ইলিশিয়া জমিলা বেগম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এসএসসি পাশ করার পর তিনি চট্টগ্রাম সরকারী বাণিজ্য কলেজ এ ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে তিনি এইচএসসিতে কুমিল্লা বোর্ডে দশম স্থান লাভ করেন। এরপর তিনি একই কলেজে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হন। তিনি সম্মান চূড়ান্ত পরীক্ষার কয়েকটি পত্র দিতে পারেননি মুক্তি সংগ্রামে জড়িয়ে পড়াতে। পরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গড় নিয়মে ফলাফল ঘোষণা করা হলে দেখা যায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন।[২]

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা Edit

শহীদ আবদুল হামিদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি সহ আরও চারজন মিলে দেশকে শত্রুমুক্ত করার অভিলাষে ভারত এর মিজোরাম রাজ্যের দেমাগ্রীতে গেরিলা প্রশিক্ষণের জন্য চলে যান। সেখানে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে স্বল্পকালীন গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। ভারত থেকে আসার সময় তাঁকে গেরিলা দলের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। দেশে ফিরেই তিনি গেরিলা তৎপরতা শুরু করেন। প্রথমেই তিনি চকরিয়া থানায় অবস্থিত হানাদার শত্রুঘাঁটিতে বেশ কয়েকটি দুঃসাহসিক গেরিলা অভিযান চালিয়ে শত্রুদের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেন। ইতিমধ্যে ইপিআর এবং নিজের দল নিয়ে হামিদ বরতমান বান্দরবান জেলার অন্তর্গত লামা থানা আক্রমন করে বিরাট সাফল্য অর্জন করেন।[৩] শত্রুসেনার সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র তাদের হস্তগত হয়। এই অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিল ৩৮টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও ৩৭০০ রাউন্ড গুলি। ওই অপারেশনে ১ জন রাজাকার নিহত ও ২ জন পুলিশ ধৃত হয়। পরে সেই পুলিশ সদস্যরাও তাঁদের দলে যোগ দেন।[৪] লামা থানা অপারেশনের পর আবদুল হামিদ অন্য আরেকটি গেরিলা গ্রুপের সাথে দেখা করতে আজিজনগর যান। সেখান থেকে ফেরার সময় জঙ্গলি পথে পিছলে পড়ে তাঁর পা মচকে যায়।[৫] আহত পা নিয়ে তিনি মায়ের সাথে দেখা করতে বাড়ি যান। উল্লেখ্য তাঁর কাছে আগে খবর এসছিল তাঁর মা অসুস্থ। হামিদের সাথে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত 'মুছা' নামক একজন মুক্তিবাহিনীর ছদ্মবেশে হানাদারদের সহযোগীর ভূমিকা গ্রহণ করে। ৪ নভেম্বর[৬] সে তার বাবা এবং অন্য একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজরকে সাথে নিয়ে তৎকালীন 'ফুরুইক্ষা' বাহিনির সহযোগিতায় হামিদের অবস্থান বমু বিলছড়ির বাড়িতে হানা দেয়। হামিদকে ধরার জন্য তারা এগিয়ে এলে হামিদ অন্ধকারে তাঁর রিভলভারটি না পেয়ে গ্রেনেড চার্জ করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ডিটোনেটর সঠিকভাবে না লাগায় গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলো না। হামিদ তাঁর ভগ্নিপতি আজমল হোছাইন এবং বড় ভাই তমিজউদ্দিনসহ ধরা পড়লেন।[৭]

যেভাবে শহীদ হলেন Edit

গ্রেপ্তার করে তাঁদেরকে লামা থানার দক্ষিণ পাশে চম্পাতলী প্রাইমারি স্কুল ঘরে এনে যারপরনাই অত্যাচার করা হয়। সেখানে একদিন রাখার পর কক্সবাজার থেকে ২ প্লাটুন পিসি আর্মস ফোর্স আনা হয় তাঁদের নেয়ার জন্য। সন্ধ্যার আগে তাঁদের নিয়ে ৪টি নৌকা আর্মি সহ রওনা দেয়। নৌকা চারটি খুব সাবধানে কাকারার মাঝের ফাঁড়ি পৌঁছে। কাকারা থেকে তাঁদেরকে গাড়িতে তোলা হয়। রাত বারোটার দিকে কনভয়টি কক্সবাজার সার্কিট হাউজে পৌছায়। তাঁদেরকে একটি কক্ষে তালা বদ্ধ করে রাখা হয়। রাত একটার দিকে শুরু হয় অকথ্য নির্যাতন। পা উপরের দিকে ছাদের রডের সাথে বেঁধে মাথা নিচের দিকে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হত। জিজ্ঞেস করা হত সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের নাম, ঠিকানা, অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ সম্পর্কে। হামিদ থাকতেন নির্বিকার। মুখে শুধু বলতেন, 'জয় বাংলা, এদেশ স্বাধীন হবেই!'[৮] তাঁর বড় ভাই তমিজউদ্দিন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক থাকার প্রমান মেলাতে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। আর একসপ্তাহ পর ভগ্নিপতি আজমল হোছাইনকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং হামিদকে টেকনাফ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার বধ্যভূমিতে ১৯ নভেম্বর শুক্রবার তাঁকে জবাই করে হত্যা করা হয়।[৯]

মৃতদেহ উদ্ধার এবং সমাধি Edit

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে হামিদের স্বজন এবং সহযোদ্ধারা পুরো কক্সবাজার চষে বেড়াতে লাগলেন তাঁর লাশ উদ্ধারের জন্য। অনেক খোঁজার পর টেকনাফের একটি বধ্যভূমি থেকে অগুনতি পঁচা লাশের মধ্য থেকে খয়েরি পাঞ্জাবির চিহ্ন সমেত হামিদের মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার করা হয়। ২৪ ডিসেম্বর শুক্রবার চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের শাহ উমর (রহঃ) এর মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে শহীদ আবদুল হামিদকে সম্পূর্ণ সামরিক কায়দায় ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধিফলকে লিখা আছে 'যাঁদের রক্তে মুক্ত এ দেশ তাঁদেরই একজন শহীদ আবদুল হামিদ।'[১০]

তথ্যসূত্র Edit

  1. প্রসঙ্গকথা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল হামিদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনাঃ নাজমা ইয়াছমীন, প্রথম প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০০৭
  2. আমার স্মৃতিতে শহীদ আবদুল হামিদ (প্রফেসর ফজলুল করিম), বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল হামিদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনাঃ নাজমা ইয়াছমীন, প্রথম প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০০৭
  3. শহীদ আবদুল হামিদ 'যার রক্তে মুক্ত এ দেশ' (এ. কে. এম গিয়াসউদ্দীন), বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল হামিদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনাঃ নাজমা ইয়াছমীন, প্রথম প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০০৭
  4. মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ আবদুল হামিদ (নজির আহমদ), বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল হামিদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনাঃ নাজমা ইয়াছমীন, প্রথম প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০০৭
  5. মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ আবদুল হামিদ (নজির আহমদ), বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল হামিদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনাঃ নাজমা ইয়াছমীন, প্রথম প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০০৭
  6. শহীদ আবদুল হামিদ এক অফুরন্ত প্রেরণার প্রতীক (হাজী বশিরুল আলম), বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল হামিদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনাঃ নাজমা ইয়াছমীন, প্রথম প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০০৭
  7. শহীদ আবদুল হামিদ (শেখ মুহম্মদ ইব্রাহিম), বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল হামিদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনাঃ নাজমা ইয়াছমীন, প্রথম প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০০৭
  8. শহীদ আবদুল হামিদ স্মরণে (আজমল হোছাইন), বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল হামিদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনাঃ নাজমা ইয়াছমীন, প্রথম প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০০৭
  9. শহীদ আবদুল হামিদ স্মরণে (আজমল হোছাইন), বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল হামিদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনাঃ নাজমা ইয়াছমীন, প্রথম প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০০৭
  10. শহীদ আবদুল হামিদ স্মরণে (রশিদ আহমদ), বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল হামিদ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনাঃ নাজমা ইয়াছমীন, প্রথম প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০০৭

Ad blocker interference detected!


Wikia is a free-to-use site that makes money from advertising. We have a modified experience for viewers using ad blockers

Wikia is not accessible if you’ve made further modifications. Remove the custom ad blocker rule(s) and the page will load as expected.

Also on FANDOM

Random Wiki